Sunday, March 2, 2014

ফিল্ম সমালোচনাঃ অভিশপ্ত নাইটি

এমনিতেই বাংলা ভাষায় সাহসী পরিচালকেরা আজকাল সাদা বাঘের মত দুর্লভ হয়ে পড়েছেন। সেখানে আজকাল বাংলা সিনেমা দেখতে গেলে খুব একটা আশা নিয়ে আর হলে যেতাম না। এবার অভিশপ্ত নাইটি সিনেমাটার উপরও খুব একটা আশা নিয়ে দেখতে যাই নি। কিন্তু হলে গিয়ে আশাহত হলাম না।

বাঙালি মধ্যবিত্ত পিউরিটান সমাজ যে তথাকথিত মূল্যবোধ ইত্যাদির কথা সকালে ইসবগুলের সাথে গুলে খায়, সেই সমাজের প্রতিনিধিরা নাক সিটকেছেন সিনেমার নাম শুনেই। মানে ওই নামের সিনেমা কি করে কোনো ভদ্রসন্তান দেখতে যায়, এই প্রশ্ন বারবার শুনছি চারদিকে।
তাদের উদ্দেশ্যে, দাদা, হলে যান, দেখে আসুন, শুধুমাত্র আপনাদের এই মাইন্ডসেট কে যাচ্ছেতাই ভাবে নেড়ে-ঘেঁটে দুমড়ে মুচড়ে ধাক্কা দিতে একটা গোটা সিনেমা তৈরি করা হয়েছে। দেখুন, আর নিজেকে, নিজের বাপ-দাদাকে খিস্তি দিন, সোসাইটিকে খিস্তি দিন। পরিচালক সেইসব দগদগে ক্ষতগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, বাকিদের মতো সেখানে ন্যাকামোর অ্যান্টিসেপ্টিক ঢালতে যাননি।

আমি কিছুদিন আগে, যখন আমার মোট দেখা সিনেমার সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ, তখন ভাবতাম সিনেমা তৈরির জন্য এক এবং একমাত্র যেটা দরকার, সেটা হল একটা নিটোল গল্প। এবার আপনি সেই ভাবনার লেভেলে থাকলে এই সিনেমাটা দেখতে যাবেন না। কারন গল্প খুঁজতে গেলে এখানে হতাশ হবেন। এখানে সেরকম কোনো গল্প বা গল্পের কাঠামো নেই।

এবার গল্প নেই যখন, কি দেখবেন?
দেখবেন একটা অসামান্য স্ক্রিপ্ট। এক পরিচালকের সাহস। এক ঝকঝকে নতুন ধারার সিনেমা। চোখা সংলাপ। এবং, আমার মতে, বাংলা ভাষায় হওয়া প্রথম "সার্থক" ব্ল্যাক কমেডি ফিল্ম এইটা।
এসব যদি নাও দেখেন, কিছু অসামান্য চরিত্রাভিনেতার অভিনয় দেখবেন। একটা টানটান স্ক্রিপ্ট পেলে আজও স্ক্রিনে সোনা ফলাবার লোক যে আমাদের টলিউডেই রয়েছেন, অন্তত এই বিশ্বাস নিয়ে হল থেকে বেরোবেন।

এবার কয়েকটা জায়গা আলাদা করে বলার দাবী রাখে।

ক্যানো সিনেমার এই নাম? সেটার জন্য হলে যান। হ্যাঁ, সিনেমায় খুন, ভূত, পুনর্জন্ম এইসব রয়েছে, কিন্তু তাও পরিচালক অশেষ সংযম দেখিয়ে এটাকে ভূতের ছবি বানিয়ে ফেলেননি। চেনা ছক ভাঙার সাহস সবার থাকে না। পরিচালক দেখিয়েছেন।

এবার সিনেমাঃ এক নাইটি আছে, যেটা পরলে মহিলাদের (যেহেতু নাইটি, তাই কেবল মহিলা। অন্য কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাঙ্গেল নেই।) অবদমিত সব চাহিদা (যৌন) মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এবার সেই নাইটি হাতবদল হতে থাকে ও সেই নিয়েই সিনেমা এগোয়।
এই প্রথম বাংলা সিনেমায় মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলো দেখানো হল এমন একটা ফর্ম এ, যেটা ধরাছোঁয়া যায়। অর্থাৎ সেটাই ওই নাইটি। স্পাইডারম্যান ৩ তে যেমন পাপ কে দেখানো হয়েছিল তার ফিজিক্যাল ফর্ম এ, কালচে থকথকে "ভেনম" হিসেবে, এখানেও তেমনই সেটা একটা গোলাপি নাইটি। কিন্তু সেটা আদৌ অভিশপ্ত, নাকি এই সমাজটাই আসলে অভিশপ্ত, সে কথা আপনার মনে হবেই সিনেমাটা দেখতে দেখতে।

এবার গোটা সিনেমাটাই কি দারুণ? আজ্ঞে না, সবটা না। কিছু দুর্বল জায়গা আছেই। একটা প্রপার গল্পের অভাবে খানিক ধৈর্য হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাছাড়া যেহেতু ব্যাপারটা বেশ খানিক "মডার্ন ডে ফেবল" ধরনে বলা, যুক্তির খোঁজ করবেন যারা, তারা হতাশ হবেন। পাওলি দামের অভিনয়, মানে ওই যেটুকু সময় ছিলেন, দুর্বলতম জায়গা। পরমব্রতও আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ঝোলানোর। ইন্দ্রনীল এতদিন পরেও খালি " সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র "-এই কথাটার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার হয়েই থেকে গেলেন। কিন্তু এগুলোর পরেও ওই একটা টানটান স্ক্রিপ্ট সব অভাব না হলেও নব্বই শতাংশ ঢেকে দিয়েছে। বিশেষ করে মনে থাকবে রবি ঠাকুর ঘটিত দৃশ্যগুলো। বাঙালির মত এরকম সাংস্কৃতিক মৌলবাদী জাতের সামনে এইরকম লোপ্পা বল দেওয়ার সাহস সবার থাকে না। পরিচালক দেখিয়েছেন।

আর সেন্সর বোর্ড সংক্রান্ত দৃশ্যগুলো করে আমাদের গালে থাপ্পড় মারবার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এই রিভিউ পড়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে সেটা ভালো না লাগলে আমার থেকে পয়সা চাইবেন না। কে বলেছে আপনাকে আমার কথায় নাচতে?

পুনশ্চঃ এই সিনেমায় দেব কে দারুণ লেগেছে। মানে তুলনামূলক কম অসহ্য আর কি।

No comments:

Post a Comment