Thursday, March 12, 2015

ভ্যালেন্টাইন দিবসের কবিতাগুচ্ছ

ভ্যালেন্টাইন দিবসের কবিতা
ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে যেসব লেখা দেখতে পাই
সেগুলো মূলতঃ দুই জাতের। একদল ক্লাসের
ফার্স্টবয়ের মতো। ঝকঝকে, সুন্দর, পরিপাটি
(মাঝেমধ্যে শ্লেষ) অচেনা লোকেদের নাম লেখা শেষে
(বোধকরি লেখাটির পিতা ওই লোকগুলো, এরা পালক)
অন্যভাষায়। প্রেমের অপকারিতা বিষয়ক।
আরেকদলের লেখা ফেল করা ছেলেগুলোর মত,
যাদের সাথে মিশতে মা-বাবা (বিশেষতঃ মা) বারন
করে দেয়, বানান ভুল, যা তা ভাবে লেখা, শ্লেষ নেই,
সফিস্টিকেশনের নামগন্ধ নেই। সারা লেখা জুড়ে
আমি ভালোই আছি তোমায় ছাড়া, নানাভাবে বলা
ইনিয়ে বিনিয়ে। ব্যাকরণ না জেনে বা মেনে।
মাতৃভাষায়, প্রেমের অপকারিতা বিষয়ক।
আমি চাই সেই ধরনের লেখা হোক, সেই ছেলেগুলোর
মত, যারা হেঁটে পয়সা বাঁচিয়ে বই কেনে, আর ক্যান্টিনে
বসে চুপচাপ মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে আনা রুটি ছেঁড়ে,
আর যাদের বন্ধু হয় না একটাও।
---------------------------------------------------
আলিঙ্গন দিবসের কবিতা
চলো আজ খেলি বরং অশ্বত্থ ও কার্নিস...
ওহ না, তোমার তো আবার সাউথ ক্যালকাটা বাতিক।
তাহলে বরং আজ খেলি জানলা আর মানিপ্ল্যান্ট।
কে হবে জানলা আর কে মানিপ্ল্যান্ট, ঠিক করবো
টস করে। এই দ্যাখো শোলের কয়েন। দুজনের
ফিফটি-ফিফটি চান্স। তুমি ছোঁড়ো, আমি ডাকি।
হেড। ধুর। জিতে গেলাম? নানানা, এ ভারি অন্যায়।
আবার হোক। আসলে তোমায় হারতে দেখলে
মাইরি বলছি, খুব দুঃখ হয়। আমি এবারেও হেড।
এবার জিতলে পরেরবার আবার হেড ডেকে দেখবো।
ল অফ অ্যাভারেজ। তুমিই জিতবে। অবশ্য মানিপ্ল্যান্ট
সাজলে তোমায় যা মানাবে না। আমি আজ জানলা সেজে থাকি বরং।
সামনের বার পাক্কা, আমি কার্নিস সাজবো।
আলিঙ্গন দিবস আজ। কি বলছো? আজ প্লেটোনিক?
কিরকম বোকা তুমি? আলিঙ্গনের মধ্যে
লিঙ্গ লুকিয়ে আছে, আগে কখনো খেয়াল করোনি?
---------------------------------------------------
প্রমিস দিবসের কবিতা
সিগারেট ছেড়ে দেবো, আর না,
এবার সত্যি। এমনকি আরেকবার
ব্যাঙ্কের পরীক্ষাতেও বসে যাবো।
অন্যবারের মত না। খানিক পড়াশোনা
আর কিছুটা পড়ালেখা। অঙ্কটা আমার
যদিও আসে না সেভাবে, তাও এবার
এসপারওসপার কিছু একটা করবই।
এমনকি ফাঁকা সিঁড়ি বা গলি
দেখে চুমু খেতেও চাইবো না।
বাড়ি ফাঁকা পেলেও বাড়ির বইপত্তর
ধুলোবালি নিয়েই কাটিয়ে দেবো।
বিজয়ায় প্রণাম, মন্দিরে প্রণামী,
এমনকি সোমবুধশুক্র টিউশন,
সব করবো এবার। মাক্কালী আর
অন্য কারোর দিকে ফিরেও তাকাবো না।
কথা দিচ্ছি, খানকির ছেলেকেও বলবো
বেশ্যাপুত্র, আজ থেকে। কাল সব ধার শোধ।
মাইরি, সব করবো, খালি সামনের বছর
প্রমিস করতে পারি এমন কাউকে এনে দিও।
---------------------------------------------------
রোজ ডে বিষয়ক একটি কবিতা।
প্রেমদিবসে কদর বাড়ে, বাকি বছর কবরস্থান,
আজকে ভাবি গোলাপ-ডে'তে মিছরি মুড়ি সব সমান।
"গোলাপকে তাই যে যাই ডাকো, প্রেমের কাজে একলা বীর"-
গোলাপ নিয়ে এমন কথা বলে গেছেন সেক্ষপীর।
গোলাপ দিয়ে ভাবছো দেবে সস্তাদরে সব ম্যানেজ?
লঙ্কাদহন করতে হনু খুইয়েছিলো নিজের লেজ।
সেই হনু আজ চোখ রাঙিয়ে খুঁজছে বিয়ে দেবার কল,
প্রেমটা কাজেই মাথায় থাকুক, এবার তবে জলকে চল।

অ্যাসাইলাম

হিসেব করে দেখতে গেলে সারাদিন একেবারে না খেয়ে রয়েছি সেরকম নয়। আবার অনেক খেয়েছি সেটাও না। মানে দুইয়ের মাঝামাঝি যে বিশাল ধূসর এলাকা, তার খানিকটা জুড়ে আছি। না খাওয়ার দিকেই খানিকটা হেলে আছি বলা যায় খিদে এখনো মাথায় আটকে আছে, পেট অবধি নামেনি। অবশ্য খিদে ক্ষেত্রবিশেষে পেটের নিচেও নামে। “আপনা মাংসে হরিণা বৈরি”, কাজেই সে নিয়ে এক আধখানা মোমবাতি মিছিল হয়ে মোমবাতি বিক্রেতাদের ইয়ার-রাউন্ড সেল নিশ্চিত করা ছাড়া খুব একটা কাজের কাজ হয় বলেও শুনি না। আমার অবশ্য এখন ইয়ার এন্ড, কাজের হুলাবিলা চাপ, সেখানে নাওয়া খাওয়ার ফুরসত মেলে না খুব একটা। নাওয়া ব্যাপারটা এমনিতেই অনিয়মিত আমার কাছে। মানে এমন নয় যে আমি হাইজিন কনশাস নই। কিন্তু আমার জল দেখলে ভালো লাগে না। জল দেখলেই কিরকম একটা, ঠাণ্ডা, ঘুমজড়ানো কম্বলের মত অন্ধকার আমায় ঢেকে ফেলে প্রতিবার। মাথা গা বেয়ে সেই অন্ধকার তারপর নামতে থাকে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছুঁয়ে আমার ভিতরের অন্ধকার ছুঁয়ে নামতে থাকে, রোমশ পা বেয়ে হিলহিলে সাপের মত শিহরণ জাগিয়ে নামতে থাকে, মায়ের পেটের ভিতর ডুবে থাকা স্মৃতির অবশেষের উপর দিয়ে নামতে থাকে। তারপর নর্দমা দিয়ে বেরিয়ে মিশে যায় আরও অনেক অন্ধকারের সাথে, মিশে বাড়তে থাকে, ফুলতে থাকে, ফুঁসতে থাকে, ছটফট করে বেরিয়ে আসার জন্য।
আমি এই বেরিয়ে আসাকে খুব ভয় পাই। তাই জল দেখলে আমার খুব ভয় লাগে। মা অনেকবার অনেক গালাগাল দিয়ে, বাবা-বাছা করেও বোঝাতে পারেনি। আমিও বোঝাতে পারিনি আমার সমস্যা। কাজেই মাথা গায়ে জলের ছিটে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি অনেকদিন ধরে। আমার মাধ্যমিক পাশ মা ধরতেও পারেনি। ঠকে গিয়েছে প্রতিবার।



ইকনমিক্সে অনার্স উশ্রী অবশ্য এসবের ধারকাছ দিয়েও যায় না। অবশ্য ও বাড়ি থাকেই বা কতক্ষণ। আর সত্যি বলতে কি, ও আমার জীবনে না থাকলে আমি হয়তো কলকাতা ছেড়ে বরাবরের মত বেরিয়ে পড়তে পারতাম। অনেকবার ভেবেছি, আজ বোধহয় উশ্রীর বাড়ি ফেরার পথে অ্যাকসিডেন্ট হল, বা কেউ ওকে আঁচড়ে কামড়ে রেখে গ্যালো, প্রাণটুকু ধুকপুক ধুকপুক করছিলো, আমার চোখে চোখ রেখে কিছু কথা বলতে চেয়ে অস্ফুট একটা গোঙানি, আর তারপরেই উশ্রী আর নেই। নিদেনপক্ষে আমার মত গুড ফর নাথিং-কে ছেড়ে অন্য কোনো বলিয়ে-কইয়ে স্মার্ট কারোর সাথে ভেগে যেতেও পারে। এটাও ভেবেছিলাম। একসময় এতবার এইসব ভাবতাম, আমার কাছে উশ্রীর অ্যাকসিডেন্টের পর থ্যাঁতলানো মুখ, ওর অস্ফুট হাবিজাবির সাথে মিশে থাকা শূন্য চোখের দৃষ্টি, ওর শ্রাদ্ধের মেনুর ডিজাইন ও রজনীগন্ধার স্টিক রাখা ফুলদানির গঠন, সব পরিষ্কার দেখতে পেতাম। খালি ও যখন আমায় বলছে আমি অমুকের সাথে চললাম, তখন সাথের লোকটার চেহারা বারবার পাল্টে যেত। কখনো কেবলের বিল নিতে আসা ছোকরা, কখনো ওর অফিসের ওই তামিল না তেলেগু কলিগ, কখনো সলমন রুশদি। ঠিক থাকতো না।


আজ অফিস ফেরত বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। কোনো ইচ্ছে নেই আমার বাবার সাথে সম্পর্ক রাখার, বা রাখলেও সেটা স্বীকার করার। উশ্রী বারবার জোর করে পাঠায়। আমার প্রতিবার মনে হয় আমার বেড়ে ওঠার অসুস্থ পরিবেশের দিকে উশ্রী এইভাবে ঘুরিয়ে ঠাট্টা করে। এমনিতেই আমার মুখ খারাপ করা বা মেগা সিরিয়াল দেখা বা উপহার পেলে বা দিতে হলে আগে তার দামের হিসেব করা-এইসবের জন্য উশ্রী আমায় খানিক অপছন্দই করে হয়তো, হয়তো কি, নিশ্চিত করে। তাও ওর কথা রেখেই আমায় মাসে একবার হলেও অ্যাসাইলাম ঘুরে আসতে হয়।  


অ্যাসাইলাম আমাদের জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। মানে পাগলাগারদ অর্থে অ্যাসাইলাম। অ্যাসাইলামের আরেকটা মানে হয় আশ্রয়, যেটা ওই নানা সরকার নানা লোকজনকে দিয়ে থাকে। কিন্তু সেটা আমার বাবার মত লোকেদের জন্য না। উশ্রীর মা, আমার বাবা, কখনো কখনো উশ্রী নিজে, এদের দেখলেই আমি বুঝি অ্যাসাইলাম জিনিসটা স্বাভাবিক সমাজে কতটা দরকার। একদিন আমি আর উশ্রী বেরিয়েছিলাম। কোথায় যেতে চাইছিলাম খেয়াল নেই। মাঝরাস্তায় কিছু একটা নিয়ে বরাবরের মত ঝামেলা হল, আমি যেমন গাড়ি চালাচ্ছিলাম সেইরকমই চালিয়ে গেলাম। খেয়াল হল যখন উশ্রী বলল আজ বাবার কাছে আসার আমাদের কোনো প্ল্যান ছিলো না। সেদিন দেখেছিলাম আমি গাড়ি বাবার অ্যাসাইলামের সামনে নিয়ে এসেছি। আসলে আমার যে সাহস কতটা কম, সেটা সেদিন বুঝেছিলাম। দরজা খুললেই হয়ে যেত, শান্তি অপেক্ষা করছিলো গাড়ির গেট আর অ্যাসাইলামের দরজার মাঝখানে। তবুও আমি সাহস করে ওইটুকু পথ পেরিয়ে উঠতে পারিনি সেইদিন। এখনও মাঝেসাঝে সেদিনের কথা ভেবে আফসোস হয়। লটারিতে ঠিক আগের বা পরের টিকিট জিতে গেলে যা আফসোস হয় মানুষের, তার থেকেও বেশি আফসোস।


অ্যাসাইলামখানা যদিও জব্বর। বাইরে বিশাল দেওয়াল। জেলখানার মত। ভিতরে একখানা ওয়েটিং রুম, তাতে একটা হনুমানের ছবি, একটা ল্যাংটো বাচ্চার ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার, ডাক্তারদের নাম এইসব পেরিয়ে রিসেপশনে এক মহিলা বসে প্রতিদিন শব্দছক সমাধান করেন। মানে আমি প্রতিদিন আসি না, বা জানি না, কিন্তু যে কবার এসেছি, এর অন্যথা হয়নি। তবে আমি ওই মহিলার সাথে কথা বলি না। আসলে গোঁফওয়ালা মেয়ে দেখলে আমার খুব অস্বস্তি হয়। এবং মহিলার গোঁফ নিয়ে আর কারোর মাথাব্যাথাই নেই। হয়তো কেউ এটা খেয়ালও করে না। আমি একবার এটা উশ্রীকে বলেছিলাম। উশ্রী এমন করে তাকিয়েছিলো, আমি আবার শীতকালের প্রত্যঙ্গের মত গুটিয়ে গিয়েছিলাম।  আমি অবশ্য যাই, ডাক্তারের সাথে গল্পগুজব করি, বাবার ঘরে একবার যাই, বাথরুম পরিষ্কার কিনা দেখার অছিলায় টুক করে নিজের কাজ সেরে নি। এরা খুব কেয়ারিং। মাসে একবারও দেখতে না গেলে বাড়িতে ফোন করে। সেইজন্যেই আমায় মাসান্তে এখানে একদিন হিসু করতে আসতে হয়।


বাড়ি ফিরে খিদে পাওয়া-না পাওয়ার মাঝখানে বসেছিলাম। ভাবছিলাম, উশ্রীর সাড়াশব্দ নেই, ওর কিছু ভালোমন্দ হল কিনা। তখনই খাবারের প্লেট সাজিয়ে আসা উশ্রীর মা-কে দেখে আমার যেটুকু খিদে ছিল, সেটাও মরে গেল। কারন ভদ্রমহিলাকে আমার একেবারে সহ্য হয় না।
তখন আমরা দুজনেই কলেজে পড়ি। একদিন উশ্রীর ফোন অফ ছিল। তখন উশ্রীর কারফিউ আওয়ার ছিল সাতটা। ফোন ব্যাটারি শেষ হয়ে বন্ধ হয় পাঁচটায়, উশ্রীকে আমি বাসে তুলে দিই ওই আন্দাজ ছটা নাগাদ, উনি আমায় ফোন করেন সাড়ে ছটায়, উশ্রী বাড়ি ফেরে পৌনে সাতটায়। উনি আমায় প্রথম প্রশ্ন করেন উশ্রী কোথায়, উত্তর নিয়ে দ্বিতীয় প্রশ্ন করেছিলেন “তুমি কত পেলে আমার মেয়েকে ছাড়বে বলো তো?”। আমি এর আগে আমার ঠাকুমার সাথে বসে দুপুরবেলা দেখা প্রসেনজিত-ঋতুপর্ণার সিনেমা ছাড়া এই জাতীয় কথা কোথাও শুনিনি। স্বাভাবিকভাবেই থ মেরে গিয়েছিলাম। উশ্রী এটা কোনোদিন মানতে চায় নি, যে উনি সত্যি আমায় এটা বলেছিলেন। বহু ঝামেলা ঝগড়ার পর আমি এটা বললেই ও বলতো আমি ভুল শুনেছি। আরে ভুল শুনবো ক্যানো? আমি কি অ্যাসাইলামে থাকি নাকি? বা কোনোদিন ছিলাম নাকি? না আমি ওইখানে যাওয়ার যোগ্য? ওখানে তো যাবে তারা, যাদের আমি পছন্দ করি না। যাদের আমার স্বাভাবিক মনে হয় না, তারা থাকবে ওই পাঁচিলের ওদিকে। আমার এদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না, তাই আমিও ওকে বলা ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন। সবাই কি আর শিবনিন্দা শুনে আছাড় খেয়ে প্রাণত্যাগ করবে নাকি?



ওর মা-কে তাই আমার পোষায় না বিশেষ। উশ্রী ওনাকে খুব ভালোবাসে। হয়তো আমার থেকেও বেশি। ভদ্রমহিলা সামনাসামনি এলেই এমন একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, যার অনেকগুলো মানে হয়। এমনিতে উনি আমার সাথে ঠিকঠাক ব্যবহার করলেও উনি তাকালেই আমার ভিতরে জমে থাকা অন্ধকারগুলো নড়াচড়া করে জেগে ওঠে হাই তোলে আড়ামোড়া ভাঙে আঙুল মটকায়। তাই উনি আজ খাবার নিয়ে এলে তক্ষুনি খাবার ইচ্ছেটা চলে গিয়েছিলো

-“একি? খাচ্ছো না ক্যানো? শরীর খারাপ?”
খেয়াল করিনি উনি আমার সামনেই বসে ছিলেন। কাষ্ঠ হাসি হেসে খাবার টেনে নিতেই আচমকা মনে হল যে উনি এত ভালোবেসে নিজে থেকে এসব করছেন ক্যানো? উশ্রীও তো বাড়ি নেই মনে হচ্ছে। খেতে গিয়ে স্বাদ অন্যরকম লাগলো, গন্ধটাও। ওনার দিকে তাকাতেই বললেন “আলুর দমটা ভালো হয়নি? কারিপাতা দিয়ে করলাম। নতুন শিখেছি।”
আমি তো জানতে চাইনি। খেতেও চাইনি। তাহলে কার জন্য খাবার আর কৈফিয়ত সাজিয়ে বসে ছিলেন? ভেবেছিলাম ফেলে দেবো, কিন্তু উশ্রী এসে পড়লো, আর আমাকেও সব খেয়ে তবেই উঠতে হল। উশ্রী খেলো না। বলল বাইরে কোথা থেকে একটা খেয়ে ঢুকেছে।


সারারাত ঘুম হয়নি। ভদ্রমহিলা একা শুতে পারেন না, তাই উশ্রী ওনার সাথে শুয়েছে। আমি সারারাত এপাশ ওপাশ করেছি। জল খেয়েছি। পাখা চালিয়ে মুখে চোখে জল দিয়েও ঘুম আসছিলো না। গলা বুক জ্বালা করছে অসম্ভব। এভাবে ঘুম আসে না আর যাই হোক। সকাল হয়েছেরোববার, তাই কেউ ওঠেনি এখনও। সারারাত জেগে আমার ঝিম ধরা মাথা প্রায় ফেটে পড়তে চাইছে। কাল অনিয়ম হল কিছু? নইলে এরকম হওয়ার কথা না তো। আচ্ছা উনি খাবারে বিষ মেশাননি তো?


বাথরুমে দাঁড়িয়ে আছি। বুক ব্যথা, পেট অসম্ভব মোচড়াচ্ছে। জানি না কতক্ষণ থাকতে পারবো। উশ্রীকে বলা যাবে না। বললে বিশ্বাস করবে না। আজ আমাদের একসাথে বেরোবার কথা, আর ওনার সাথে আমার যা সম্পর্ক, নিশ্চয়ই ভাববে আমি এড়াতে চাইছি ওদের। ওদের চোখের সামনে থেকে সারাদিন বেরোতে পারবো না। কাজেই বুঝতেও পারবো না, আদৌ কিছু হয়েছে কিনা। আর উশ্রীকে যদি বলি আমার সন্দেহের কথা, তাহলে আবার সেই তখনকার মত ঝামেলা হবে। তখন ভালোবাসার অজুহাত ছিলো, তাই মিটে গিয়েছিলো। এখন সে সুযোগও নেই।


তাই বাথরুমে দাঁড়িয়ে। শব্দ শুনছি, উনি আবার রান্নাঘরে ঢুকেছেন। উশ্রী তাড়া মারছে আমায়, খাবার ঠাণ্ডা হচ্ছে এই কথা বলে। আর কতক্ষন থাকবো এখানে? বেশিক্ষণ থাকতেও তো পারবো না। কারন আমার জল দেখলে ভালো লাগে না। জল দেখলেই কিরকম একটা, ঠাণ্ডা, ঘুমজড়ানো কম্বলের মত অন্ধকার আমায় ঢেকে ফেলে প্রতিবার। মাথা গা বেয়ে সেই অন্ধকার তারপর নামতে থাকে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছুঁয়ে আমার ভিতরের অন্ধকার ছুঁয়ে নামতে থাকে, রোমশ পা বেয়ে হিলহিলে সাপের মত শিহরণ জাগিয়ে নামতে থাকে, মায়ের পেটের ভিতর ডুবে থাকা স্মৃতির অবশেষের উপর দিয়ে নামতে থাকে। তারপর নর্দমা দিয়ে বেরিয়ে মিশে যায় আরও অনেক অন্ধকারের সাথে, মিশে বাড়তে থাকে, ফুলতে থাকে, ফুঁসতে থাকে, ছটফট করে বেরিয়ে আসার জন্য।
আমি এই বেরিয়ে আসাকে খুব ভয় পাই। তাই জল দেখলে আমার খুব ভয় লাগে। মা অনেকবার অনেক গালাগাল দিয়ে, বাবা-বাছা করেও বোঝাতে পারেনি। আমিও বোঝাতে পারিনি আমার সমস্যা। কাজেই মাথা গায়ে জলের ছিটে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি অনেকদিন ধরে। আমার মাধ্যমিক পাশ মা ধরতেও পারেনি। ঠকে গিয়েছে প্রতিবার। জানি না ইকনমিক্সে অনার্স উশ্রী আর ওর মা-কে আমি ঠকাতে পারবো কিনা।



আমায় আজও বেরোতে হবে। দুটো অ্যাসাইলামের একখানা অন্তত খুঁজতে।

একুশে

সকাল হইতেই অপুর মন খারাপ। সর্বজয়া উহাকে ধাক্কা মারিয়া ঘুম থেকে তুলিয়া দিয়াছেন। আজ উহাকে পাঠশালায় যাইতেই হইবে। সর্বজয়ার বক্তব্য ইংরিজি না জানিলে আজিকের দিনে কিছু করিয়া ওঠা দুষ্কর। হরিহর খানিক আপত্তি জানাইয়াছিল বটে, সর্বজয়ার মুখঝামটা খাইয়া উহাকে সিগারেট ধরাইতে হইয়াছে। সর্বজয়া দায়িত্ব লইয়া উহাকে হুঁকো ছাড়াইয়া সিগারেট ধরাইয়াছিলো, এখনকার নব্যযুবকেরা আবারও যাহাতে মজিয়াছে সেই হুক্কা যে বস্তুত থেলো হুঁকোরই নামান্তর, ইহা জানিয়া সে হাত কামড়াইতে বাকি রাখিয়াছে।
দাওয়াতে বসিয়া অপু কর্নফ্লেক্স খাইতেছিলো। সর্বজয়ার বক্তব্য, ইহা সাহেবি খাবার, সাহেব হইতে গেলে অতএব ইহাই গিলিতে হইবে। অপু কর্নফ্লেক্স না খাইয়া উঠিয়া যাবার তাল করিতেছিল। সর্বজয়া দেখিয়াই বুঝিলেন। হরিহরের উদ্দেশ্যে বলিলেন, "ইহারা খাইবে কি? দুবেলা খালি কর্নফ্লেক্স আর কর্নফ্লেক্স। বাছাদের পাতে যে বেকন-সসেজ তুলিয়া দিবো, তাহার উপায় কি? ঘরওয়াপসির জ্বালায় গরু কাটিলেই গর্দান কাটিবে। সোয়াইন ফ্লু আসিয়া শূকরের সাপ্লাই কমাইয়াছে। বাছারা খাইবে কি?"। হরিহর কি করিবেন না বুঝিয়া সিগারেট ফুঁকিতে লাগিলেন।
অপু বাহির হইবার পথে দেখিলো, উহার মা দিদিকে বেদম ঠ্যাঙ্গাইতেছেন। অপু বুঝিলো ইন্দির ঠাকরুন পাঁচালী পড়ে পড়ে মুখের স্বাদ বদলাইবার কারনে উহাকে দিয়া আরব্যরজনী(খরতর) আনাইয়াছেন, যাহার বই সে চাহিতে আসিয়াছে। সর্বজয়া চক্ষু লাল করিয়া বলিতেছেন, "কতবার বলি, বাংলা বই ছুঁসনে, তবুও এ হারামজাদী উহা ঘরে আনিবেই। আর আপনাকেও বলিহারি, এইটুকু মেয়েকে দিয়ে বাংলা বই আনাইতেছেন? আপনি আর কয়দিন? ইহাদের লইয়া আমাকেই থাকিতে হইবে। আর পড়িতেই হয় যদি, আমাদের ফিফটি শেডস অফ গ্রে কি দোষ করিলো?"
অপু কিছু না বলিয়া বাহির হইয়া গেল। দুদিন আগেই দিদির সাথে উহার ঝামেলা হইয়াছে। সে বলিয়াছিলো, কি ছাই রবীন্দ্রনাথ পড়িস? চেতন ভগত পড়। নিজের চিন্তাটাকে এ লেভেলে লইয়া যা। ফলস্বরূপ তাহাকে সেদিন সারাদিন "অপু এ লেভেলে, অপু এ লেভেলে" শুনিতে হইয়াছিল।
অপু পাঠশালায় গিয়া দেখিলো ক্লাস সেইদিন হইবে না। কোনো এক কারনে উহাদের পাঠশালা সেইদিন ছুটি। রফিক-বরকত-সালাম-জব্বার ইহারা শহিদ হইয়াছেন, কাজেই পাঠশালা বসিবে না। অপু ইহাদের চেনে না। সালাম বলিতেই উহার নমস্তে মনে হয়, এই লইয়া দিদি সারাক্ষণ ঠাট্টা করে। অপু বাড়ি ফিরিয়া গেল।
হরিহর দাওয়ায় বসিয়া আসন্ন পালা ভাবিতেছিলেন। সর্বজয়া উহাকে মুখ ঝামটা দিয়া কহিল, বাংলায় শেষ যে উপন্যাস লিখিলে, উহার আনন্দপ্রাপ্তি হইবে কবে। হরিহর কহিল, "আনন্দরা এমনিতে ভালোমানুষ, ইদানিং বিজেপিতে মজিয়াছে। উহারা সময়মত দিয়া দিবে। কত আলবালছাল ছাপা হয়, আর হরিহর মুখুজ্যের লেখা সেখানে কি এমন দোষ করিল? আনন্দ মিলিলেই প্রকাশকেরা লাইন দিয়া লেখা ছাপাইবে।"
সর্বজয়া ভাবিলো, সত্যই তো। তাহার স্বামী বাংলায় লেখেন ইহা তো তাহার দোষ নহে। ইংরিজিতে কত পসার তাহা ইনি কি জানেন। এ পোড়ার ভাষায় কেউ কথাই বলে না, লেখা তো দুরস্থান। তবুও অভীকবাবু মানুষ ভালো, বাঙ্গালীর কালচার নিজের হাতে গড়িয়া দিয়াছেন। ইহারা এত স্মরণজিতের লেখা ছাপিতেছে, সেখানে এম এ পাশ হরিহরের লেখাও কি ছাপিবে না? তাহার বেশি চাহিদা নাই। বালিগঞ্জে একখানা থ্রি বি এইচ কে, একখানা গাড়ি, অপু দুর্গার ইংরিজি মিডিয়াম স্কুল, পালা-পার্বনে অল্প হুইস্কি, আর অ্যানিভার্সারিতে সলিটেয়ার, ইহাই তো দাবী তাহার। এই হইলেই সে খুশি।
রফিক-বরকত-সালাম উপর থেকে মুচকি হাসিলেন। জব্বার গম্ভীর মানুষ, তিনি হাসিতে পারিলেন না।

ফেসবুক বিপ্লবীদের প্রতি খোলা কবিতা, আপাতত ছন্দের হড়কানি সামলে, ঈষৎ এডিটেডঃ

বিপ্লবী হে বিপ্লবী হে, তোমার পোস্টে যাবো
বিপ্লবী গো, তুমিও এখন লাইক পাবে ভাবো?
বিপ্লবী হে, ফেসবুকেতে স্ট্যাটাস দিয়েছিলে,
বিশাল স্ট্যাটাস, আমি ভাবি, কি করে ভাই দিলে?
আমি তখন টু লাইনার, আমার লাইক বিশ,
বিপ্লবী হে, তোমার লাইক তিনশো বিয়াল্লিশ।
তুমি তখন বছর পঁচিশ, তুমি তখন ডিপি
বিপ্লব হয় ফেসবুকেতে, ফোনের বোতাম টিপি-
বিপ্লবী হে বিপ্লবী হে, সেলফি তোলো ভালো,
মিছিল করে বেড়িয়ে এলে, গাধারা লাইকালো
তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বিপ্লবী, আজ মোর স্ট্যাটাসেও তিনশো লাইক পড়ে।
কুঞ্জে অলি গুঞ্জে, সেটাও দিয়েছো হ্যাশট্যাগে
সন্ধেবেলা দেখি, সেথায় লাইক কুড়োও ব্যাগে।
আমি তখন তিনশো লাইক, আমি তখন শেয়ার,
আমায় ডেকে হেল্প চেয়েছো, আমি থোড়াই কেয়ার।
বিপ্লবী হে বিপ্লবী হে, এতদিনের পরে
সত্যি বলো, এই বয়সেও বাজারি কেউ করে?
যেসব কথা বলছো তুমি বিশাল স্ট্যাটাস লিখে,
আমার খালি সন্দেহ হয়, আদৌ কিছু শিখে-
বলছো কি? নাকি সবাই ওই টিউবের আলো
দেখেই কেবল তালি দিচ্ছে, ভাবছে বুঝি হ্যালো
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চোখ
কমেন্ট করে বলেছিলাম, তোমার ভালো হোক।
রাতে এখন ঘুমাতে যাই, দেড়শো শেয়ার নিয়ে
চোখের সামনে ল্যাপটপে প্রোফাইলেতে গিয়ে
দেখেছিলাম, আদর্শ সব চোরাপথের বাঁকে
মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ খোঁজটা কোথায় থাকে।
আজকে লাইক, আজকে শেয়ার, লাগছে প্রবল ফানি,
তুমি এখন এই এলাকার সেলাই দিদিমনি।
আগুন, তবু বিপ্লবী হে, আগুন জ্বলে কই?
কেমন হবে, আমিও যদি বিক্ষুব্ধই হই?