Wednesday, December 10, 2014

ষষ্ঠ রিপু

"এক প্রত্যন্ত বনের ক্লিয়ারিং। পূর্ণিমার রাত। একটা লোক একা দাঁড়িয়ে আছে। ক্লিয়ারিঙের মধ্যে দিয়ে অন্ধকার ভেদ করে জ্যোৎস্নার আলো নেমে আসছে। লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়ে খাচ্ছে। ধোঁয়াটা ঘুরপাক খেয়ে উঠছে জ্যোৎস্নার আলোর মধ্যে......"
ডক্টর বাসু তাকিয়ে দেখলেন সামনে বসা ভদ্রলোকের দিকে। বয়েস আন্দাজ পঁয়ত্রিশ। মানে তার থেকে বছর কুড়ি কম। এই বয়েসে এইজাতীয় উপসর্গ দেখা যাওয়া অস্বাভাবিক হলেও বিরল নয়। বিশেষতঃ ইনি যে প্রবলেম নিয়ে এসেছেন, রেকারিং স্বপ্নের, সেরকম কেস বহুবার এসেছে তার কাছে। কিছুই না, সামান্য কিছু টক থেরাপি, নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার কয়েকটা ওষুধ, আর নিয়মিত ঘুম হওয়ার জন্য একটা ওষুধ, এতেই শতকরা নব্বইজন সেরে যায়। যে দশজন বাকি থাকে, তাদের কথা আলাদা। অবশ্য সংখ্যালঘুদের কথা ভেবে কোন কাজটাই বা হয় এই দেশে?
একটানা কথা বলে লোকটি চুপ করে গেছে। এটাই হয় এইরকম রোগীদের ক্ষেত্রে। এক স্বপ্ন বারবার দেখতে দেখতে তারা সেই স্বপ্ন বানাতেও থাকে। মানে বারবার করে বর্ণনা দিতে দিতে তারা স্বপ্নটাকেও পাল্টে ফেলতে থাকে। বলার ক্ষেত্রে। কারন লোকজন আকছার তাদের জিজ্ঞেস করতে থাকে "এইটুকু? এ আর রোজ দেখলে কি? আমরা ভেবেছিলাম........."। এবার লোকজন কিভাবে বুঝবে, দুঃস্বপ্ন না হলেও এই রোজকার রেকারিং স্বপ্নই এদের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাতে আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মানুষও অস্বাভাবিক আচরন করতে থাকে।
"আপনি কবে থেকে এই স্বপ্ন দেখছেন?"
"তা প্রায় তিন মাস।"
"এতদিন পর?"
"প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম মামুলি ঘটনা। তারপর আস্তে আস্তে রোজ দেখতে থাকি যখন, তখন ভয় শুরু হয়। তারপর আমার এক বন্ধু আপনার নাম সাজেস্ট করে। অতঃপর......"
"আই সি। আপনি ভেবে দেখুন তো, লোকটাকে চেনেন আপনি? বা জায়গাটা?"
"না। লোকটার মুখ দেখতে পাইনি। কোনোদিন না। এমনকি পরের দিকে, যখন বুঝতে পারতাম এটা স্বপ্ন, তখনো তার সামনে যেতে পারতাম না।"
"কিচ্ছু চেনা না? জায়গাটার কোনো ডিটেল? লোকটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি?"
"বিশ্বাস করুন, কিচ্ছু না।"
"আপনি এক কাজ করুন। আগামী এক সপ্তাহ এই ওষুধগুলো খান, যেগুলো লিখে দিচ্ছি। একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি। দেখুন। এক সপ্তাহ পর দেখা করবেন।"
আধঘণ্টার উপর দাঁড়িয়ে আছি। সামনে এন আর এস হাসপাতাল, তাই এই ওষুধের দোকানটায় মারাত্মক ভিড়। এদিকে আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আজ রাতে আমার ডুয়ারস যাওয়ার কথা। ওষুধগুলো কিনতেই হবে। কারন এই ওষুধগুলো আমার স্ত্রীর জন্য। আমরা বহুদিন পর কোথাও যাওয়ার ছুটি পেয়েছি। শ্রীরূপা কম কথা শোনায়নি। এবার এখানে আটকে পড়লে......
একটা ঝামেলার আওয়াজে সম্বিত ফিরলো। লাইনের সামনের লোকটাকে কাউন্টার থেকে ওষুধ দিচ্ছে না।
"প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ দেওয়া যায় না।"
"দয়া করে দিন। আমার প্রেসক্রিপশন হারিয়ে গেছে। ডাক্তারবাবু এক সপ্তাহ খেতে বলেছেন। আমার ঘুম হবে না এটা না খেলে।"
"বললাম তো, এত হেভি ডোজের ঘুমের ওষুধ দিতে পারবো না।"
"আরে আমার খেয়াল আছে কি লিখেছিলেন উনি......"
শ্রীরূপার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালাম। ঘুমোলে কি নিষ্পাপ দেখায় ওকে।
বাংলোটা বেশ। শুধু একদিকে খাড়া খাদ। ওখানে আগে বেশ কয়েকটা দুর্ঘটনা হয়েছে। এটা আগেরবার এসে জেনেছিলাম। আগেরবার মানে বছর কুড়ি আগে, যখন আমার বয়েস পনের। সেবার বাবা-মায়ের সাথে এসেছিলাম।
এঁটো থালাবাসনগুলো ধুয়ে রাখলাম। দরকার ছিল।
শ্রীরূপা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোবেই। এক মাসের ঘুমের ওষুধ পেটে পড়লে যে কেউ ঘুমোতে বাধ্য।
হ্যাঁ, কাউন্টারের ছেলেটা আমায় কিছু জিজ্ঞেস করেনি। কেন করবে? গতকালের তারিখের প্রেসক্রিপশন, পরের দিন ওষুধ নিচ্ছি, একমাসের, আর কিছু জিজ্ঞেস করে?
শ্রীরূপার খাবারে মেশাতে একটুও অসুবিধে হয়নি। এমনকি খাদে ফেলে দিতেও অসুবিধে হবে না। ওষুধে না মরলেও, এই খাড়া খাদে পড়লে যে কেউ মরবে।
কেন করলাম? ওই, ওথেলো।
ওথেলো রুমাল দেখেছিল। আমি পেয়েছিলাম গন্ধ। ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ। অতনু ব্যবহার করে ওটা। জানি। তিনমাস ধরে ওদের মেলামেশা একটু বেশিই চোখে পড়ছিল। এমনকি অফিস পার্টির দিনও আমি ওদের লক্ষ্য করেছিলাম সারাক্ষণ।
ডাক্তারবাবুকে সবটা মিথ্যে বলিনি। তিনমাস। তিনমাস সত্যি ঘুম হয়নি আমার।
এখান থেকে সোজা কলকাতায় ফিরব আমি। দুদিন পর থানায় রিপোর্ট। এমনকি এখানকার ঘর বুক করেছে শ্রীরূপা। আমিই করিয়েছি। এখানে রেজিস্টারে সইটাও ওর। আমায় রিসেপসনের যে দেখেছে, হলপ করে বলতে পারি কলকাতায় গিয়ে দাড়ি কেটে ফেললে আর সানগ্লাস-মাফলার খোলার পর, তার পিতৃদেবও আমায় চিনবেন না।
আজ পূর্ণিমা খেয়াল করিনি। সামনের খোলা জায়গাটায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে। পকেট হাতড়ে সিগারেট বের করলাম একটা......