Thursday, March 12, 2015

একুশে

সকাল হইতেই অপুর মন খারাপ। সর্বজয়া উহাকে ধাক্কা মারিয়া ঘুম থেকে তুলিয়া দিয়াছেন। আজ উহাকে পাঠশালায় যাইতেই হইবে। সর্বজয়ার বক্তব্য ইংরিজি না জানিলে আজিকের দিনে কিছু করিয়া ওঠা দুষ্কর। হরিহর খানিক আপত্তি জানাইয়াছিল বটে, সর্বজয়ার মুখঝামটা খাইয়া উহাকে সিগারেট ধরাইতে হইয়াছে। সর্বজয়া দায়িত্ব লইয়া উহাকে হুঁকো ছাড়াইয়া সিগারেট ধরাইয়াছিলো, এখনকার নব্যযুবকেরা আবারও যাহাতে মজিয়াছে সেই হুক্কা যে বস্তুত থেলো হুঁকোরই নামান্তর, ইহা জানিয়া সে হাত কামড়াইতে বাকি রাখিয়াছে।
দাওয়াতে বসিয়া অপু কর্নফ্লেক্স খাইতেছিলো। সর্বজয়ার বক্তব্য, ইহা সাহেবি খাবার, সাহেব হইতে গেলে অতএব ইহাই গিলিতে হইবে। অপু কর্নফ্লেক্স না খাইয়া উঠিয়া যাবার তাল করিতেছিল। সর্বজয়া দেখিয়াই বুঝিলেন। হরিহরের উদ্দেশ্যে বলিলেন, "ইহারা খাইবে কি? দুবেলা খালি কর্নফ্লেক্স আর কর্নফ্লেক্স। বাছাদের পাতে যে বেকন-সসেজ তুলিয়া দিবো, তাহার উপায় কি? ঘরওয়াপসির জ্বালায় গরু কাটিলেই গর্দান কাটিবে। সোয়াইন ফ্লু আসিয়া শূকরের সাপ্লাই কমাইয়াছে। বাছারা খাইবে কি?"। হরিহর কি করিবেন না বুঝিয়া সিগারেট ফুঁকিতে লাগিলেন।
অপু বাহির হইবার পথে দেখিলো, উহার মা দিদিকে বেদম ঠ্যাঙ্গাইতেছেন। অপু বুঝিলো ইন্দির ঠাকরুন পাঁচালী পড়ে পড়ে মুখের স্বাদ বদলাইবার কারনে উহাকে দিয়া আরব্যরজনী(খরতর) আনাইয়াছেন, যাহার বই সে চাহিতে আসিয়াছে। সর্বজয়া চক্ষু লাল করিয়া বলিতেছেন, "কতবার বলি, বাংলা বই ছুঁসনে, তবুও এ হারামজাদী উহা ঘরে আনিবেই। আর আপনাকেও বলিহারি, এইটুকু মেয়েকে দিয়ে বাংলা বই আনাইতেছেন? আপনি আর কয়দিন? ইহাদের লইয়া আমাকেই থাকিতে হইবে। আর পড়িতেই হয় যদি, আমাদের ফিফটি শেডস অফ গ্রে কি দোষ করিলো?"
অপু কিছু না বলিয়া বাহির হইয়া গেল। দুদিন আগেই দিদির সাথে উহার ঝামেলা হইয়াছে। সে বলিয়াছিলো, কি ছাই রবীন্দ্রনাথ পড়িস? চেতন ভগত পড়। নিজের চিন্তাটাকে এ লেভেলে লইয়া যা। ফলস্বরূপ তাহাকে সেদিন সারাদিন "অপু এ লেভেলে, অপু এ লেভেলে" শুনিতে হইয়াছিল।
অপু পাঠশালায় গিয়া দেখিলো ক্লাস সেইদিন হইবে না। কোনো এক কারনে উহাদের পাঠশালা সেইদিন ছুটি। রফিক-বরকত-সালাম-জব্বার ইহারা শহিদ হইয়াছেন, কাজেই পাঠশালা বসিবে না। অপু ইহাদের চেনে না। সালাম বলিতেই উহার নমস্তে মনে হয়, এই লইয়া দিদি সারাক্ষণ ঠাট্টা করে। অপু বাড়ি ফিরিয়া গেল।
হরিহর দাওয়ায় বসিয়া আসন্ন পালা ভাবিতেছিলেন। সর্বজয়া উহাকে মুখ ঝামটা দিয়া কহিল, বাংলায় শেষ যে উপন্যাস লিখিলে, উহার আনন্দপ্রাপ্তি হইবে কবে। হরিহর কহিল, "আনন্দরা এমনিতে ভালোমানুষ, ইদানিং বিজেপিতে মজিয়াছে। উহারা সময়মত দিয়া দিবে। কত আলবালছাল ছাপা হয়, আর হরিহর মুখুজ্যের লেখা সেখানে কি এমন দোষ করিল? আনন্দ মিলিলেই প্রকাশকেরা লাইন দিয়া লেখা ছাপাইবে।"
সর্বজয়া ভাবিলো, সত্যই তো। তাহার স্বামী বাংলায় লেখেন ইহা তো তাহার দোষ নহে। ইংরিজিতে কত পসার তাহা ইনি কি জানেন। এ পোড়ার ভাষায় কেউ কথাই বলে না, লেখা তো দুরস্থান। তবুও অভীকবাবু মানুষ ভালো, বাঙ্গালীর কালচার নিজের হাতে গড়িয়া দিয়াছেন। ইহারা এত স্মরণজিতের লেখা ছাপিতেছে, সেখানে এম এ পাশ হরিহরের লেখাও কি ছাপিবে না? তাহার বেশি চাহিদা নাই। বালিগঞ্জে একখানা থ্রি বি এইচ কে, একখানা গাড়ি, অপু দুর্গার ইংরিজি মিডিয়াম স্কুল, পালা-পার্বনে অল্প হুইস্কি, আর অ্যানিভার্সারিতে সলিটেয়ার, ইহাই তো দাবী তাহার। এই হইলেই সে খুশি।
রফিক-বরকত-সালাম উপর থেকে মুচকি হাসিলেন। জব্বার গম্ভীর মানুষ, তিনি হাসিতে পারিলেন না।

No comments:

Post a Comment